মোবাইল কথন

  মোবাইল কথন

হঠাৎ করে আমাদের মতি সাহেবের কথা মনে পড়ে গেল। ভদ্র লোক গিয়েছিলেন টয়লেটে জরুরী কাজে সাথে ছিল শখের মোবাইল ফোনখানা। আরাম করে যখন প্রাকৃতিক কাজে হাত দিলেন তখনি তার ফোনখানা ঝংকার হুংকার শুরু করে দিল। রিংটোন ছিলো পরান বন্ধু তুমি কই গেলা… গানের অংশ বিশেষ। এই সিচুয়েশন তার তেমন জানা ছিলো না তাই তিনি ফোন রিসিভ করতে চাইলেন আর অমনি ফোনটা পড়ে গেল কমোডের ভেতরে। হায় হায়! একি হয়ে গেল? প্রাকৃতিক কাজ আর শেষ করা হল না। তিনি তড়িঘড়ি করে উঠে দাঁড়ালেন। হায় সর্বনাশা ফোন একি হলো? গুগলের জনপ্রিয় সফটওয়ার আন্ড্রয়িড চালিত দামি ফোন বলে কথা। ইমেইল এস এম এস কত কিছু সেইভ করা। আহ!

হাত দিয়ে দিয়েছেন কমোডের ভিতরে কিন্তু ততক্ষণে মোবাইলের কানে মুখে পেটে জলের প্রবাহ শেষ। অন্ধকার হয়ে গেছে ডিসপ্লে । বন্ধ হয়ে গেছে তাৎক্ষনিক। তবু পাগল মন বোঝেনা সেসব। পাগলপারা হয়ে গেলেন বাইরের মোবাইল সার্ভিসিং দোকানে। কপালে ঘামের ফোঁটা ফোঁটা জমাট। আহ! একি হল? গত মাসেই কিনেছেন ফোন প্রায় দশ হাজারের মত খরচ হয়ে গেছে। ফ্লিপ কভারের দাম নিয়েছে একশ টাকা। আর নিয়েছে মেমরী কার্ডের দাম। ওফ! মনে হলেই গা দিয়ে কেমন যেন শীতল স্রোত চলে যায়।

অনেক ঘাটাঘাটি করে মেকানিকের হেড কর্মচারী বলল, আপনার ফোন গেছে গাঁ। আর ঠিক হইব না।

কথা শুনে মতি সাহেবের ইচ্ছে করছিল ব্যাটাকে ধরে নিয়ে পেটায় কিন্তু তখনি আবার প্রকৃতির অসম্পুর্ন কাজের ডাক শুরু হলো। তিনি ফোন নিয়ে বাড়ি ফিরে এলেন এবং এসেই অজ্ঞান হয়ে গেলেন। ডাক্তার এসে চেকাপ করে বললেন, তিনি স্ট্রোক করেচেন হসপিটালে নিয়ে যান তাড়াতাড়ি।

তাই করা হলো। তার প্রাকৃতিক সেই কাজ তিনি শেষ করেছেন হাসপাতালে যাবার সময়। ডাক্তার সাহেবের তীব্র মনোবলের কারণে আর অবিরত চেষ্টায় সেবারের মতো তিনি বেঁচেই গেলেন। আজ আমি তাই তার সেই কথা মনে পড়ায় যত না কষ্ট পাচ্ছি তারচে’ বেশি পাচ্ছি ভয়। ভয় পাবো না কেন, কেবল ফোন করেছি এক ভদ্র লোককে , তিনি ফোন ধরলেন, কথা বললেন। শেষে বললেন তিনি কেবল টয়লেটের দিকে যাচ্ছেন। অমনি আমার মধ্যে ঢুকে গেল ভয়। না জানি আবার কোন মতি সাহেবের কাহিনী ঘটে যায়?

আমি তো কেবল দশ বছর হলো এই মোবাইলের সাথে আছি। এখন সুবিধা আছে, কাউকে দরকার পড়লে একটা কল দিয়ে এটা ওটা পরমায়েশ করা যায়। এই এটা দিও, একটা পান খাওয়ার জন্যেও অনেকে ফোন করেন। ভাই একটা পান খেয়ে যাবেন? অবাক করে দেয় লোক গুলো। ভাল লাগে না মন্দ লাগে তা বুঝি না। তবে লোকেরা তাই করে বৈকি। ফোন ব্যবহারের সবচে’ খারাপ যাই থাকুক অফিসিয়াল কাজে কাউকে ফোন দিলে, প্রায়ই শুনি নাম্বারটি ব্যস্ত আছে। এমন হয়েছিল একবার এক ভদ্রলোককে সারাদিন ফোন দিয়েই যাচ্ছি দিয়েই যাচ্ছি আর শুনেই যাচ্ছি, “নাম্বারটি ব্যস্ত আছে” ভাবলাম যুগের হাওয়া তো কলি যুগে আরো কত কি বের হবে তো অন্য নাম্বার থেকে একটা কল করি! যেমন ভাবা তেমন কাজ। লেগেই গেল। পেয়েও গেলাম। ভদ্রলোক কথা বললেন নির্লজ্জের মতো। আমি ভেবেছি অন্তত দোষ স্বীকার করে কোন একটা কারণ হয়ত বলবেন। কিন্তু সেরকম হয়নি। তিনি বড়ই হারামির পরিচয় দিলেন। খোদ অফিসিয়াল বলে তার সাথে কাজ করি নয়তো এমন লোকের আশেপাশে যাওয়ার আগে নিজের নাম পরিবর্তন করে ভিখারি সাইফুল রেখে দিতাম। মোবাইলে ব্ল্যাক লিস্টে আমার নাম রেখে দিয়েছে সে!

মায়ের সাথে আমি নর্মালী খুব বেশি কথা বলি না। বলার মত তেমন কিছু নাই। এটা আমার আগেকার স্বভাব। সদ্যজাত নয়। তবু মাঝে মধ্যে আমি কথা বলি। খোজ নেই। কিন্তু বড়ই আশ্চর্যের বিষয় হলো, মা তুমি কেমন আছো? ভাত খাইছো? এই করছ সেই করছ এই টাইপের কথন আমি পারি না। আমার হয় না। কোথায় যেন একটা কৃত্তিম স্বভাব আমার ভিতরে ভর করে আছে। আমার কখনোই দরকারি ছাড়া ফোনে কথা বলতে ইচ্ছা হয় না। কিন্তু তাতে কি? আমার মা’ত রেগেমেগে আগুন। ছেলে আমার বউয়ের কথা ছাড়া আর কারো কথা ভাবেই না। এই আইডিয়া পুষে রেখেছে। কিছুই করার নেই। অথচ দশ বছরের আগে যখন ফোন ছিল না , তখন কি করত? আমি তখনো বাড়ির বাইরে থাকতাম। আমাকে কেউ খবর দিত না বাড়ি যাবার জন্যে। এই মা আর সেই মা কেবল পালটে গেল মোবাইল ফোনের জন্যে?

তাই ভাবি আর কাউকে ফোন কল দিব না। সরাসরি কল দিব। বাড়ীর কাছে গিয়ে গলা বাড়িয়ে বলব, কই ভাই লোকমান কোথায় আছিস বাইরে আয়। তাতে আবার পুরনো ফ্যাশন ফিরে আসবে। কিছুটা ভ্রান্তি কেটে যাবে হয়ত।

ফোন পাবার পর থেকে যে সুবিধাটা বেশি হয়েছে তা হলো প্রেমিক প্রেমিকার ঘনিষ্ট সময় কাটানো। আহ কি আরাম। ঠিক যেন মতি সাহেবের প্রাকৃতিক কাজে হাত দেয়ার মতই। তবু ভাল ছিল যদি মেয়েরা কিছুটা ভাল থাকত। মেয়েগুলো আহামরি টাইপের বোকা। ছেলেদের পাল্লায় পড়ে সব হারায়, প্রাণটা পর্যন্ত। কি বিশ্বাস হচ্ছে না? না হবার কারণ কি?