ভিক্ষা বৃত্তি

ভিক্ষা নিরুতসাহ প্রকল্প!!

গত বছরের মাঝামাঝি আমি উত্তরার আজমপুরে কয়েকজন ভিক্ষুকের কবলে পড়ি। করুন তাদের চোখের দৃষ্টি আর কন্ঠভরা আকুতি মিনতি! আমার মত কঠিন দিলকেও নরম করে দিয়েছিলো! সেদিনের আগে আমি ভিক্ষুকদের শুধু এভোয়েড করতাম। ভাবতাম এদের নিরুতসাহিত করার জন্য জনমত গঠন করবো। ভিক্ষা নিরুতসাহিত করার প্রধান কাজ হচ্ছে ভিক্ষা না দেয়া। কিন্তু সেদিন আমি নতুন করে ভাবতে শুরু করি। ভিক্ষুকদের নিয়ে নিজে নিজে জরিপ করি। একমাসের মত আমার জরিপ চলে। কোন ডকুমেন্টেশন মেইন্টেইন না করেই আমি একটা সামারি দাঁড় করাই।
ভিক্ষুক মানে ভিক্ষুক নয়, এরা একটা বিজনেসের অংশ মাত্র! একেকজন ভিক্ষুক একেকভাবে ব্যাবসায় জড়িত।
আমি যে উদ্দ্যেশ্যে জরিপ করেছি তা ছিলো ভিক্ষুকদের ভিক্ষা পেশা থেকে সরিয়ে আনার পেছনে আমাদের করনীয়। সে সময় আমার মাথায় এসেছিলো এদেরকে দিয়ে কী কাজ করানো যায়? এদের বর্তমান আয় কত কিংবা জীবন ধারনের জন্য এদের ন্যুনতম কত টাকা লাগে ইত্যাদি ইত্যাদি। জরিপ শেষে আমি মাথায় হাত দিয়ে বসে পড়ি। কারন এদের অনেকের আয় আমার নিজের মাসিক আয়ের চেয়েও বেশি। এটা নেহায়েত কোন ভিক্ষা নয় এটা পুরাই প্রফেশনাল এরিয়া। এর পেছনের হাত কিংবা লিংক রয়েছে অনেক দুর পর্যন্ত।

imagesএকেবারে ঢালাওভাবে সবাই যে এমন তা কিন্তু নয়। অল্প কিছু ভিক্ষুক আছে যারা অনেক জায়গায় গিয়ে ভিক্ষা করে শুধু বেঁচে থাকার চেষ্টা করে। তাদের মধ্যে কেউই আবার নতুন কিছু করার কথা চিন্তাও করে না। তাদের চিন্তাজগত ভিক্ষাতেই আটকে আছে। কোন অফার পেলে বলছে, কেন ভিক্ষা করে তো খেয়ে পরে আছি!!

ব্যাক্তিগতভাবে আমি ভিক্ষাকে ঘৃনা করি। অনেকেই করেন। আবার অনেকেই ভালবাসেন। যদি ভাল নাই বাসেন তবে ভিক্ষা দেন কেন? আমার কাছে ভিক্ষা দেয়া মানষিক নির্যাতনের সমান। ভিক্ষা না দেয়া মানে আত্মবিশ্বাসী কিংবা দৃড় মনোবলের সমান। আমি খুব কম ভিক্ষা দেই। একেবারেই না কেন? কিছু প্রফেশনাল ভিক্ষুক আছে যারা আপনার সময় কিংবা সিচুয়েশন কে নিয়ন্ত্রিন করে ফেলে তাই ভিক্ষা তাদের দিতেই হয়। এজন্য ১০০%ভিক্ষা না দেয়া লোক হতেই পারিনি।
ভিক্ষার আরেকটা বিপরীত দিক চিন্তা করুন, সহযোগীতা। সাহায্য! আমার আশেপাশের অনেক দরিদ্র জনগোষ্ঠী আছে যাদের আমি বাতসরিক একটা এমাউন্ট যদি দেই তারা অনেক বড় কিছু করে দেখাতে পারে। আমি সেই সহযোগীতার কথাই বলছি। ৫ থেকে ১০ টাকা সহযোগীতা নয়। ক্ষুদ্র এমাউন্ট মানুষের কাজে কম আসে। ভিক্ষায় সাধারন মানুষ মাত্র ২০ টাকায় অনেক পুন্য আশা করে, কিন্তু ভাবে না যে এই ২০টাকা একজন মানুষকে ভিক্ষুক বানাতে সহায়তা করেছে, বাস্তবিক সহযোগীতা হয় নি। আমি নিজে যা করি তাহলো, কারো বিপদের সময়ে ৫০ কিংবা ১০০ ভাগ সহযোগীতা করি যাতে সে আর কারো কাছে যেতে না হয়। এজন্য সেই সহযোগীতা কার্যকরী হলো কি না সেই ফলোয়াপ থাকে।
ভিক্ষা এক সপ্তাহেই বন্ধ করা যায়, যদি আমরা সবাই ভিক্ষা দেয়া বন্ধ করে দেই। ১৬ কোটি মানুষের কাছে এই বার্তা পৌঁছে দেয়া অনেক সময়ের তাই ভিক্ষা বন্ধ হতেও অনেক সময়ের দরকার। আবার এই গনতান্ত্রিক দেশে এর বিরোধী মত যে প্রতিবাদ করবে না তা তো হয় না। এসব মিলিয়ে অনেক বড় একটি আন্দোলনের নাম ভিক্ষা বন্ধকরন আন্দোলন।

ভিক্ষুকদের নিয়ে যে প্ল্যান আমার মাথায় এসেছিল তা ছিলো ভিক্ষার শ্রমকে অর্থনীতিতে কিংবা উতপাদনে যুক্ত করা। সম্ভব হয়নি কারন আমি ভড়কে গিয়েছিলাম। এই প্রফেশন অনেকেই ছাড়তে চায় না বলেই। বাধাও আছে অনেক। অনেক লেভেলে এদের প্রসেসিং চলে, যোগাযোগ আছে। ভিক্ষুক মাফিয়া আছে। দালাল চক্র আছে। শুধু ভিক্ষুকরাই এ টাকার উপর নির্ভর নয়, অনেক মানুষ এর উপর নির্ভরশীল। বহু ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান এর সাথে জড়িত। তাই খালি হাতে নিজেকে চলন্ত বেপরোয়া বাসের সামনে ছেড়ে দিতে মন চাইল না।

গতকাল দেখলাম প্রধানমন্ত্রীর উদ্যোগ, ভিক্ষুকদের ঘরে ফেরা কর্মসুচী! ভাল চিন্তা। ভিক্ষুকদের জন্য জীবন নির্ধারন অনেক কঠিন একটা কাজ, তবু ভিক্ষার অভিসাপ থেকে জাতিকে মুক্তি দিতে সরকারি আন্তরিকতা দরকার সবার আগে।