বিবর্তনে বাংলা ভাষা

বাংলাদেশের বাংলা ভাষা বিবর্তন!

বাংলাদেশে অনেক বেনিয়া এসেছিলো ব্যবসায়িক সুবাধে। অবাধে তাদের বিচরন দখল করেছে মানুষের জান মাল কিংবা মুখের ভাষাকেও। বাংলা ভাষা ভাষীরা অনেক আগে থেকেই এমন ছিলো, নতুন কিছু পেলে সেটাকেই গ্রহন করা। তাই গ্রহন এর প্রচলন হতে শুরু করল। ওলন্দাজ, পর্তুগাল, ফারসি, হিন্দি, ইংরেজিতে ফুলে ফুলে উঠেছে বাংলা ভাষার উদর।  উর্দু আর বাকী থাকে কিভাবে? সে এল পুরা ভাষাটাই বাদ দিয়ে দিতে। ভাষার মধ্যে সহানুভূতি টের পেয়ে গিয়েছিলো তখনকার শাসকেরা। তারা দেখতে পেয়েছিলো, এই ভূ-খন্ডের মানুষ নতুন সব কিছুকেই আঁকড়ে ধরে নিজের সম্পদ বিসর্জন দিয়েও। তাই ঘোষনা এসেছিলো, উর্দুই হবে পুর্ব বাংলার রাষ্ট্রীয় ভাষা। অনেকটা এমনই মনে হয় আমার।

কিন্তু সে সময় হয়ত ভাষা বীর সৈনিকেরাও ছিলো। যারা বাংলাকে ভালবাসত। বাংলার নিজস্বতা, গন্ধ আর স্বকীয়তাকে নিজের মনে করত যারা তারাই জীবন যুদ্ধে নেমে গিয়েছিলেন। বাংলা ভাষা জয় লাভ করল। আজ আমি লিখছি বাংলায়, তাদেরই অবদান। কিন্তু জানেন, আমার কাছে একই প্রশ্ন, এই কয়েক শ’ যুগ ধরে ভাষার এত বিবর্তন এলো-সব বিদেশী শব্দ দিয়ে। তাহলে কেন দরকার ছিলো সেই ভাষা জন্য জীবন দিয়ে দেয়া?

অবাক হচ্ছেন? ভাষার বিবর্তন কই হয়েছে? দেখুন, আঞ্চলিক ভাষা থেকে শুরু করি। নোয়াখালিতে কিল বলতে বুঝায় মারা। আর ইংরেজি কিল(kill) শব্দের অর্থও মারা।এটাই এখন বাংলা ভাষা।

কেউ কিছু ছুঁড়ে দিয়ে বলে ক্যাচ ধর! ক্যাচ কিন্তু ইংরেজি শব্দ। আবার কম্পিউটারের আবির্ভাবের পর শুরু হয়ে গেল হাজারো ইংরেজীর প্রচলন। এবার বলা হচ্ছে- স্ক্রীন, কী-বোর্ড, ক্যাচিং, যত ডিভাইস বা যন্ত্র আছে সব গুলোই ইংরেজিতে। এর কোন বাংলা শব্দ নেই। কেউ দিতে পারে নি। টেলিফোন যার অর্থ এত জটিল যে দূর আলাপনী বলতে কেউ পচন্দ করলেন না। শেষে টেলিফোন ই প্রতিষ্ঠিত হয়ে গেল। প্রযুক্তি এসেছে বাংলার জায়গায় বিদেশী শব্দ চালু হয়েছে।

বেতার শব্দটা কিছুটা জনপ্রিয়তা পেলেও সবাই রেডিও নিয়ে ব্যাস্ত। অন্য দিকে টেলিভিশন শব্দটা কেউ বাংলায় নিয়ে আসতেই পারল না। এটা বাংলা ভাষার জন্য লজ্জ্বার কি না কে জানে। যন্ত্র একটা করে আবিস্কার হয় আর সেই শব্দটা ভিনদেশের হয়ে বাংলায় জায়গা পেয়ে যায়। খুবই সহজ। একদিন নাকি আবার পুরো ভাষাটাই বদলানোর চিন্তা ঢুকে যায় সবার?

এল ভ্রাম্যমান দুরালাপনী যন্ত্র। একে বিদেশীরা মোবাইল ফোন বললেও বাঙ্গালীরা বলে মোবাইল। সেই যাই হোক, মোবাই থেকে মোবাইল কোর্ট, মোবাইল হেলথ কেয়ার ইত্যাদি চালু হয়ে গেল। আর মোবাইলের সবচে বড় বিপ্লব হচ্ছে, অনেক গুলো ইংরেজী শব্দ কে ঝাঁকে ঝাঁকে নিয়ে চলে এল। টাচ, প্যাড, এমবি, জিবি, কেবি, ক্যামেরা, পিক্সেল, রেজুল্যুশন, কোয়ালিটি, মেমোরী, ডাটা, চার্জার, ক্যাচিং, হেডফোন, স্পিকার, কল, লাউড স্পিকার, বান্ডেল মিনিট, পিক আওয়ার, অফ পিক আওয়ার, রিসিভ, মেসেজ, টেক্স, এম এম এস , ইমেইল কত কি নতুন বাংলা শব্দ শুনতে হচ্ছে?

বাংলার চর্চা হয় কোথায়? সবাই কোয়ালিটি নিয়ে ব্যস্ত। গান শুনবেন? আরে বাবা হিন্দি গানের কোয়ালিটি  আর কই পাবা? মামা, এই গানই ভাল লাগে, রাখ তোর বাংলা পাতিল পেটানো গান! এখনকার ছেলেমেয়েরা এভাবেই বলেন। শুরু হয়ে যায় হিন্দির প্রচলন। হিন্দি ভাষায় বাতচিত চলে। বন্ধুদের মধ্যে দুষ্টামি চলে, কেউ বা বলে হিন্দিতে আর কেউবা বলে উর্দুতে। আবার অনেকেই আজকাল দেখি হিন্দিতেই সারাদিন কথা বলেন। সম্ভবত এই অবস্থা ইন্ডিয়ানরাও জানে। না জানলে সেদিন এক জন আমাকে ইন্ডিয়া থেকে ফোন করে জানতে চেয়েছিলো আমি হিন্দি জানি কি না? জানলে যেন হিন্দিতেই বলি! আমার মন গেছে খারাপ হয়ে। বাংলাদেশী হয়েছি বলে কি এবার হিন্দিও জানতে হবে? কেন রে বাপ? যদি এতই মেধাবী হস তবে বাংলা শিখে আমার সাথে বাংলায় কথা বল। তা না হলে ইংরেজিতে কথা বলছিই তো। আন্তর্জাতিক ভাষা।

ইন্ডিয়ানরা মনে মনে আশা করে বাংলাদেশীরা হিন্দি জানতে পারে। তার কারন, ওরাও আমাদের দূর্বলতা জানে। আমাদের কিসের প্রতি টান সেটা তারা জানে। এক ইন্ডিয়ান আমাকে জিজ্ঞেস করেছিলো, তুমি হিন্দি জানো না কেন? হিন্দি ছবি দেখ না? হিন্দি গান শোন না?

আমি বলেছিলাম, না, আমি হিন্দি কোন  কিছুই দেখি না। আমি শুধু বাংলা আর ইংরেজি দেখি। কলকাতার বাংলা কিছু হলে দেখি।

ভদ্রলোক আর কথা বাড়ালেন না। তার মনে অনেক দুঃখ। আমি হিন্দি জানি না কেন?

বিষয়টা আরো ক্লিয়ার করে বলি। আমার মনেও সমান দুঃখ, তবে তার আগে বাড়তি দুঃখ হচ্ছে আমার বাংলাদেশীরাই ভাল করে বাংলা বলে না কেন? শেষ দুঃখ হচ্ছে বাংলা ই যদি একমাত্র আন্তর্জাতিক ভাষা হতো তাহলে কী মজা হতো! সেটা সম্ভব নয় জানি। কারন বাংলা খুব ছোট একটি জনগোষ্ঠীর ভাষা। বহু লোক আছে একে বিলোপ করতে চেয়েছিলো এবং এখনও চায়। বহু যুগ ধরে এই ভাষায় অন্যান্য শব্দ ঢুকিয়ে দেয়া হয়েছে, হচ্ছে যেন একদিন শেষ হয়ে যায়।

মাঝে মধ্যেই চিন্তা হয়। এক সময় আমাদের বাংলায় বাংলা ভাষা বলতে হয়ত থাকবে, কিছু সামান্য শব্দ যেগুলো অভ্যাসের বসে বদলাবে না। আর বাকি সব অন্য ভাষা থাকবে। এমন ধারনা আসতেই পারে।