friendship

বন্ধু আলাউদ্দিনের গল্প

আলাউদ্দিন তার মা’কে হারিয়েছিল কবে সে কথা আমার মনে নেই। যখন থেকে তাকে দেখছিলাম তখন থেকেই তাকে সবাই জানতাম সে এক মা’ হারা ছেলে। বাবা আরেক বিবাহ করেছেন তাই খুব সম্ভবত ছোট বেলা থেকেই সে তার নানীর আশ্রয়ে থাকতে শুরু করেছিল। আমাদের দূরন্ত শৈশব যেখান থেকে শুরু হয়েছিল সেখান থেকেই এই আলাউদ্দিন যুক্ত হয়ে গিয়েছিল বন্ধু মহলে। তখন আমরা সবে স্কুলে যাওয়া শুরু করেছিলাম। ক্লাস ওয়ান। ক্লাস শেষে এক যোগে আড্ডা শুরু হয়ে যেত আমাদের পাঁচ ছ’জনের সেই গ্রুপের। আলাউদ্দিন একমাত্র ছেলে যে স্কুলে যেত না। তাতে আমাদের খুব বেশি ঝামেলা ছিল না। মাঝে মাঝে বাবা মা’র কাছ থেকে কিছুটা বাধা আসতো, আনপড়ুয়া ছেলের সাথে মিশলে সব বাবা মা’রাই এমন বকাঝকা দেয়। আলাউদ্দিন কে বাড়ির সবাই আলোদ্দিন বলে ডাকত। কেউ কেউ আলু পটল ও বলত। তবে তাকে রাগানোর জন্য আমরা আলু’ই বলতাম। নানার আলু, গোল আলু।  মজা পেতে এমন নাম সবারই দু’একটা ছিল। কারো নাম ছিলো চেরাগ আলী, সাইকেল,  কেউ ছিল কল্লি ইত্যাদি ইত্যাদি।

কিছুটা ব্যতিক্রম থাকলেও আলোদ্দিনের স্বভাব ছিল সাধারন। সে সত্যিই এক বঞ্চিত ছেলে। আনন্দ বঞ্চিত, শিক্ষা বঞ্চিত এবং মাতৃস্নেহ বঞ্চিত। নানীই হয়ত তার শেষ সম্বল ছিল, এজন্যই নানী ছাড়া সে একদিনও থাকতে পারে নি। তাকে বহুবার খুব মারধোর করতে করতে তার বাবা আর বড় ভাই যখন তাদের বাড়ীতে নিয়ে যেত তখন সে আবার ফিরে চলে আসত। কেন আসত কে জানে। এত ছোট একটা ছেলে হয়ত তার নানীর আদর , আমাদের আড্ডা, সংগ এসব তাকে টেনে নিয়ে আসত। তার মন সেই বাবার বাড়িতে টিকতোই না। হয়ত কিছু নিষ্ঠুরতাও ছিলো সেই বাড়িতে। আমরা কখনোই সেটা বুঝতাম না। আমাদের দুঃখ হতো যখন তাকে মারতে মারতে তার বাবা নিয়ে যেত। আজ হঠাৎ এই লেখা লিখবার সময় আমার চোখ ভিজেই যাচ্ছিল, তার কারন আমি তার সেই ক্রন্দিত মুখ মনে করতে পারছি। অসহায়ের মতো সে বলেছিল, যামুনা, এখানেই থাকব আমি। কিন্তু কেউ শুনেনি। এজন্যেই সেও হয়ত কারো কথা না শুনে ফেরত চলে এসেছিল।

এরকম যখন কিছুবার চলছিল তখন তার বাবা আর আলোদ্দিনের খবর নেয়া ছেড়ে দিয়েছে। ওর যাত্রা স্থায়ী হচ্ছিলো নানার বাড়ীতেই। নানী থরথরে বুড়ো, নানাও ঠিক লাঠি ছাড়া হাঁটতে পারেন না। অভাবের সংসার এই নানা নানীর। নিজেদের খাবারের বন্দোবস্ত যেখানে কঠিন সেখানে নাতীর জন্যে আয়োজন আরেকটু কাঠিন্য ঢেকে এনেছিল। তবু স্নেহের ভান্ডারে কমতি ছিলো না বলেই মনে হয়।

দুষ্টুমীতে আলোদ্দিন ছিল হটকেক টাইপের চরিত্র। তাকে ছাড়া আমাদের দুষ্টুমী অপুর্ন থেকে যেত। আমাদের বাড়ির পাশে বেশ কিছু হিন্দু বাড়ি আছে। শারদীয় পুজার আগে ও পরে যে বাজি বোমা ফাটানো উৎসব হয় সেখানে আমাদের অংশগ্রহন ছিল জব্বেশ। এর জন্য বাজেট কখনোই ছিলোনা। চৌমুহনী বাজারে যেতাম ফুল টীম। কেউ বাদ গেলেও আলোদ্দিন ছিলো আবশ্যিক। কারন তাকে ছাড়া ঐ কঠিন কাজ সম্ভব ছিলো না। সন্ধ্যায় বাজারের দোকানে ভীড় হয়ে যেত কঠিনতর। সেই ভীড়ের জন্য আমাদের কাজ হয়ে যেত খুবই সহজ। কিভাবে যেন একটা টাইমিং এর মধ্যে আমাদের ব্যাগ ভরে যেত অজস্র সব বাজি, পটকা, আর পাথর বোমায়। তারকা বাজি, ভোজ বাজি আরো কত কি যে নাম। একেক দোকান থেকে একেক বান্ডেল গায়েব হয়ে যেত, দোকানীর চোখের সামনেই। টের পাওয়া তো দুরের কথা সন্দেহ পর্যন্ত করত না। আমি ভীত হয়ে পড়তাম। কিন্তু ঘাবড়াতাম না। কারন ওরা আছে হেল্প করবে।

মিশন সাকসেস করে যখন বাড়ি চলে আসতাম তখন হিরো আবার সেই-ই। সে নিজেই শুরু করত কাজ। রাতের অন্ধকারে লাল নীল আলোয় ভরিয়ে দিতাম আমরা আর সব নরম কঠিন শব্দে।

ছেলেটার মেধা ছিল চরম। কোন কাজ কেউ করতে দিলেই সে দুই কথা না বলে কাজ শুরু করত। দক্ষ হয়ে গেছিলো খুব অল্প সময়ের মধ্যেই। নারিকেল গাছে ওঠা, তাল গাছে ওঠা খুব সহজ কাজ ছিলো না। আমি নারিকেল গাছে উঠতে শিখেছিলাম প্রায় ষষ্ট শ্রেনীতে পড়ার সময়। আর আলোদ্দিন সেটা করতে পারত আমার ক্লাস ওয়ানের সময়েই। সে আমার থেকে হয়তবা বছর দুয়েকের বড় হবে। এই যা। আশেপাশের অনেকের কাজ করতে করতে তার প্রায় তিনবেলা খাবারের ব্যবস্থাটাও হয়ে গেল। নানানানীর কিছুটা স্বস্তি হল। এইভাবে চলতে থাকলে কি হবে কেউ ভাবেনি।

এর মধ্যেই নানা মরে গেলেন। আলোদ্দিনের নানা ছিলেন নামাজী একজন মানুষ। অন্যের কাজ করতেন, আর নিজের জমি চাষ করতেন। শারিরীক ভাবে তিনি খুব বেশি শক্ত না থাকলেও টাকা পয়সার জন্য কাজ করতেই হত। একছেলে ছিল তার। নারায়নগঞ্জের আদমজী জুটমিলে কাজ করতো । টাকা পয়সা পাঠাতো কিছু, সাধ্যমত। সেটা সেই সংসারে হয়ত পর্যাপ্ত ছিলো না।  তাদের দারিদ্রতা সবাই দেখে ফেলতো। ঢেকে রাখার মত ছিলো না। এই সংসারে সবাই দারিদ্রতা ঢেকে রাখতে চায়। যারা পারে না তারাই রাস্তায় নেমে আসে। ওরা রাস্তায় নামেনি নেমেছিল কাজে।

সামাজিকভাবে আলোদ্দিনের পরিচিতি ছিলো, অসহায় একটা ছেলে হিসেবে। অন্যের কাজ করা হয়ে গিয়েছিল তার তখনকার জীবিকা। নানার মৃত্যুর পর নানীও মরে গেল। দেখার মতো আর কেউ থাকলো না।  তবু সে এই বাড়ি ছেড়ে দেয় নি। কিছু একটা তাকে আকৃষ্ট করে ফেলেছিল। কী সেটা আজো জানি না আমি। কাজ শেষে তার ভাগ্যে মারপিট জুটে যাওয়া খুব সহজ ছিল। তাকে দিয়ে কাজ করিয়ে পারিশ্রমিক না দিয়ে মার দিতে দেখেছি অনেক। পাষন্ড আমার সেই আশপাশের মানুষ ! তাদের নাম নিয়ে আজ আর কষ্ট পেতে চাই না। অসামাজিক কুরুচির সেই লোকগুলো যেখানে অসহায় একটা ছেলের দুঃখই বুঝতো না সেখানে অন্য কিছু আশা করা বৃথা। তাই সে প্রসংগ বাদ দিয়ে যাই।

আলোদ্দিনের সাথে স্মৃতির শেষ নেই আর। সব শেষ কাজ হয়েছিল একছড়ি কলা দিয়ে। তখন আমি ক্লাস এইট কিংবা নাইন এ পড়ি। অসাধারন একটা অভিজ্ঞতা ছিল এই ঘটনা। মনে করতেই চাই নি। তবু আলোদ্দিনের নাম চলে আসায় মনে করতে হচ্ছে। এই টিমে আমরা পাঁচ জন ছিলাম। আলোদ্দিনের দক্ষতাই আবার কাজে দিল। এক লোকের শখের কলাগাছ, সাগর কলার চাষ করতে শুরু করেছিল কেবল। আমাদের এলাকায় এসব কলার চাষ রেয়ার হয়। তাই সেই কলায় যখন কিছুটা হলুদ রঙের আভা এসেছে তখনই টিমের সিদ্ধান্ত হল এটা রাতে কেটে নিয়ে আসা হবে। যেমন চিন্তা তেমন কাজ। রাতেই কাজ শেষ। আমাদের যার যার ঘরে গিয়ে ঘুমিয়ে পড়ি। সকালেই শুরু হয় নতুন গুজব। আমাদের টিম নাকি ওই বাড়ির সব কিছুই চুরি করেছে। এমন একটা প্রমান তাদের কাছে আছে। আমি আর আমার আরেক সংগী পুরাই ঘাবড়ে গেছিলাম। আলোদ্দিন কোথায় যেন চলে গেছিলো কিছুদিনের জন্যে। সবাই শুধু সন্দেহ করছিল, তেমন প্রমান কেউ-ই দেখাতে পারেনি। আর হুমকি ধামকি দিচ্ছিলো। পুলিশের ভয় দেখাচ্ছিলো। এলাকার কেউ কেউ বলছিল আমিই নাকি এর ঘটনার নায়ক!

এমন সময়ে আমার একটা সুযোগ আসায় আমি গ্রাম ছেড়ে দেই। অন্যরা যে যার মতো কিছুদিন গা ঢাকা দেয়। সবমিলিয়ে কিভাবে যেন সেই ঘটনা থেকে সবাই রক্ষা পেয়ে যাই মনে নেই। তবে সেটা আজ থেকে ১৭ বছর আগের ঘটনা। তারপর আলোদ্দিন আর চোখের সামনে পড়ে না। বেচারা কোথায় আছে আমি তাও জানি না।  চার পাঁচ বছরের পরে যখন আবার বাড়িতে গেলাম, সব কিছু ঠিকঠাক হয়ে গেছিলো। সবাই ভালো আমাদের সাথে। তখন আমি টেক্সটাইলে পড়ি। কিছু কিছু ছাত্র ছাত্রী প্রাইভেট পড়াই। কিন্তু আলোদ্দিনের সাথে তেমন কোন যোগাযোগ পাইনি। এই সময়ে আমি প্রচন্ড ব্যাস্ত ছিলাম। ঠিক এখনকার মতো। এক মিনিট সময় আমার হিসেবের মধ্যে ছিলো। মনেই আসে নি আলোদ্দিনের নাম।

 

আজ হঠাৎ ওর কথা বার বার মনে পড়ছে। কোথায় আছে ও? ওর জীবন শেষে কি কিছুটা পাল্টাতে পেরেছে? নাকি এখনো সে একটি অসহায় মানুষের মতই আছে?