পাখির হাটে

টংগী বাজারের রবিবারের আয়োজন পাখির হাটে অনিচ্ছায় ঢুকে পড়লাম গতকাল রবিবার। প্রথমেই ভেবেছিলাম খুব ছোটখাট কোন হাট হবে এটি। কিন্তু ভেতরে গিয়ে দেখি নেহায়াত ছোট নয়। বড় আছে। অনেক দূর চলে গেছে ভেতরের দিকে। বাইরেও ফুট ওভার ব্রিজের গোড়া অবধি বিস্তৃতি লাভ করেছে।

শুরুতেই চোখে পড়ে গেল কোয়েলের বিশাল বিপননী কেন্দ্র। এখানে কোয়েলের বাচ্চা থেকে শুরু করে ডিম পাড়ছে এমন কোয়েলও আছে। দোকানী কি মনে করে কয়েকটি মুরগীর বাচ্চাও রেখেছে।

koyel for sell

সাধারনত টিয়া পাখি আর অন্যান্য সব রঙ্গীন পাখি দেখা যায় তার পরপরই। খাঁচায় বন্দী লাজুক পাখিরা চেয়ে থাকে কখন তাদের নতুন মালিকের দেখা মিলবে। মালিক আসে গায়ে হাত দেয়, উষ্ণতা দেখে, কিংবা সৌন্দর্য্য দেখে দাম জানতে চায়। পুরনো মালিক দাম একটু বেশি বললে, নতুন মালিকের রাগ উঠে। এভাবেই চলে এখানের দর কষাকষি।

টিয়া পাখির কেন্দ্র

পাখিদের এই হাটে একমাত্র পশুর নাম খরগোস। অবলা এই প্রানীটি শুধু বেড়ে উঠেছে নিজেকে পশু হিসাবেও মুল্যায়িত করতে পারল না। তা না হলে পাখিদের হাটে তাকে আসতে হয়? গরু ছাগলের হাটেই তাকে শুধু তোলা উচিৎ ছিলো না? সে যাই হোক, মানুষ তাদের দেখতে আসে, কিনে নিয়ে যায়। তারপর কি হয় কে জানে… অনেকেই নাকি খরগোসের মাংশ খেতে খুব ভালবাসেন।

DSC_0235

টিয়া আর অন্যান্য জাতের অনেক পাখি আছে এখানে। ক্রেতা নেই তাই বিক্রেতারা আপাতত ফোনে সময় ব্যয় করে দিচ্ছেন। হয়ত ফোন করেই ক্রেতা নিয়ে আসার ব্যাবস্থা করে যাচ্ছেন। তবে এমনিতে এই হাটে প্রচুর জনমানুষের ভিড় হয়।

DSC_0234

হাটের সবচে’ বেশি যে জাতের পাখি আছে তার নাম কবুতর। পায়রা আর কবুতর যে এক নয় এটা এখানকার এক ক্রেতার কাছ থেকে জানা গেল। আমি নিজে জানতাম দু’টা শব্দ একই অর্থে ব্যাবহৃত হয়। কি জানি হয়ত এতদিন ভুল জানতাম। নিচের ছবিতে যে পায়রা আছে তার মুল্য প্রতি পেয়ার ৫ হাজারের মত হাঁকা হচ্ছে।

DSC_0233

পায়রাদের আবার অনেক বিলাসী চেহারা আছে। মানুষের যেমন কিছু অভিজাত মার্কা চেহারা থাকে, এদেরও আছে। এদের চেহারাটা সত্যিই গরিবের সাথে যায় না। নিতান্তই দাম যদি শুনে থাকেন তবে বুঝবেন যে এরা অনেক রাজপরিবারের জন্য প্রযোয্য হয়ে থাকবে। দাম হাকা হচ্ছিল পনের হাজারের মত করে পেয়ার। DSC_0231

এই ব্যাবসায়ীর অনেক পুরনো ব্যাবসা হচ্ছে এটি। তিনি সকল শ্রেনীর কবুতরের কালেকশন রাখেন। কিছু গৃহপালিত কবুতরের মালিকেরা এসে তার কাছে বেচে দেয় তাদের প্রিয় পালিত কবুতর। সেটি আবার হাত ঘুরে চলে যায় অন্য মালিকের কাছে। মাঝে থেকে এই মধ্যস্বত্বভোগীর ক্যাশ বাক্সে কিছু ক্যাশ জমা হয়। তার কাছে কেবল একজন এলেন একজোড়া কবুতর বেচবেন বলে।

DSC_0227

কাল কবতরের জাত দেখে অনেকে জালালী কবুতর ভেবে বসেন। আসলে এরা একটি ভিন্ন জাতের খুব উন্নত শ্রেনীর কতুতর। বলছিলেন নিচের খাঁচাবন্দী কবুতরের মালিক। তার কাছে অনেক আশ্চর্য জাতের কবুতরের সংগ্রহ আছে।

DSC_0229

এই কবুতরেরা মুক্ত হয়েও যেতে চায় না মালিকের আশপাশে ছেড়ে। এরা প্রভুভক্ত। বেচে দিলে হয়ত আবারো ফিরে আসবে।

DSC_0228

পেশা যাদের কবুতর লালন পালন তাদের কিছুটা নেশাও আছে এমন কিছুর। তাই ছুটে আসে এসব সংগ্রহ দেখতে। আর নিজেরাই হয়ে যায় কবুতরের ভক্ত। নেশায় আছে কবুতর

ক্ষুদ্র কবুতর ব্যাবসায়ীর সংগ্রহ একদিন বেড়ে যাবে এই আশা পুষে আছেন তিনি। DSC_0225

 

 

 

 

 

 

DSC_0224

এপাশের বন্দী অন্যপাশের বন্দীর খবর জানার চেষ্টাই হয়ত করছে। হয়ত ভাবছে, তোকে কোথায় পাঠাচ্ছে রে? আমাকে তো মনে হয় আজরাঈলের কাছেই পাঠান হচ্ছে। খেয়ে ফেলতে পারে!

DSC_0223

দরদাম ঠিক হচ্ছে। তবু যেন খুশি নয় বিক্রেতা আর ক্রেতা দুজনেই। চলছে আরো সিরিয়াস দরাদরি।

কিনছেন ক্রেতারা

মানুষের চাহিদা অনেক। জনসমাগম আরো বেশি। তাই ভীড়ের মাঝে চলছে বিস্তর দরাদরি। আসছে মানুষ চলছে বেচাকেনা। পাখিদের জীবনের পরিবর্তন!DSC_0221

ভাই এত দামে কি আর বিক্রি হয়? কমান না দামটা? বিক্রেতা হাসে না, সিরিয়াস হয়ে বলে, এই দামে কিনতেও পারি নি বাবা।DSC_0220

এখনো চলছে সেই দরাদরি ব্যাবস্থা। কে জিতবে আর কে ঠকবে তার মধ্যেই ফাইট। ঠান্ডা মাথায় বিক্রেতা। ক্রেতার মাথা কিছূটা গরম!DSC_0219

এই ক্রেতা নিজের পচন্দের কবুতর পেয়ে মহা খুশি! আহা, পেয়ে গেলাম। DSC_0218

এখনো বিক্রিই হয় নি। বহুদামী কবুতর আছে কেবল এখানেই। চাচার অনেক নামি কালেকশন্স!DSC_0217

রঙ ছড়িয়ে যে পাখি আকাশে বেড়াতে চেয়েছিল তার আশা ভংগ হয়েছে শিকারীর বিচক্ষনতায়। শেষে খাঁচায় বন্দী হয়ে পাড়ি জমাচ্ছে অজানা এক শহরের কোন এক বারান্দায় কিংবা খুপছি ঘরে। সে হয়ত প্রতিদিনই কেঁদে বলবে আমাকে মুক্তি দাও, কিন্তু মালিক ভাববে সে তো দারুন গান গায়! আহা কি মিষ্টি গলা! DSC_0214পাখিদের গলা মিষ্টি হয়, এটা প্রাকৃতিক। তাদের চেহারাও হয় অমলিন সুন্দর। রঙ তাদের গায়ে গতরে থাকে। সেই পাখিদের জন্য মানুষের মনে নেই কোন মায়া। তাই তারাও পন্য। তাদের দিয়ে ব্যাবসা হচ্ছে। হয়ত এখানের ট্রানজাংকশন অনেক বেশি। ব্যাংকে হয়ত এই খাতেই মুনাফার একটা শতাংশের হিসাব আছে। কিন্তু পাখিদের কান্না কি কেউ দেখেছে কখনো?

পাখিরা কাঁদলেও মিষ্টি শুনতে পাওয়া যায়। তাদের কান্না দেখার সময় হয়ত অনেকেরই নেই। পাখিদের জন্য যে জগত সুন্দর তাকে সেখানে না রেখেই বাজারে তোলার আহা কি চেষ্টা! সফল সেই মানুষেরা!