নয়ে ছয়ে দুনিয়া

বাবা নেই কবে থেকে সেটা আমার মা জানেন, কিন্তু মা নেই কবে থেকে সেটা মনে আছে। এই কত আর হবে বছর দশেকের মত। আমি আমার একমাত্র ফ্যামিলি মেম্বার আর কেউ নাই। তবু বেশ ভাল কাটছে। অন্য মেম্বার সহ থাকলে ভাল লাগত কিন্তু তাতে কি, সবার কি সব কিছু থাকা লাগবে? আমার মা মারা যাবার সময় আমাকে অনেক টাকা পয়সা দিয়ে গেছে। আমি সেগুলো দিয়ে ভালোই ব্যবসা করে যাচ্ছি, কোন অসুবিধা নাই। সকালে ঘুম থেকে উঠে কি যে শান্তিতে এক কাপ চা খাই, মনে হয় আরো অনেক বছর কেন আমি এই সব শান্তি পাইনি। আমার বয়স টা কত মনে হয় আপনার?

লোকটি প্রশ্ন করে থামলও। আমি কিছু বলব কি বলব না করতে করতেই লোকটি আবার শুরু করে দিল।

বেশি না, মাত্র আটাইশ বছর। পড়ালেখা করেছি কিন্তু ভাল ভাবে করতে পারিনি। আপনার সাথে কিভাবে কথা বলতে হবে তা প্রায় ভুলে গেছি। আপনাকে আমার বয়স জিজ্ঞাস করা মোটেই উচিত হয় নি। কি বলেন?

আমি হড়বড় করে বললাম, আরে না, কি যে বলেন।

আবারো সে বলতে শুরু করে দিল, না এই মুহুর্তে আমার মনে হচ্ছে আপনাকে কেন এত কথা বলছি। আপনাকে তো এত কথা বলা উচিত না। আচ্ছা আপনার জীবনের সবচে আনন্দের সময় পেয়েছেন কখন কোথায়?

আমি তো রীতিমত অবাক! এই লোক কে এতক্ষণ ভেবেছিলাম পাগল গোছের কেউ হবে এখন তো দেখি সেরকম না। উত্তর না দেওয়াটা অভদ্রতা। তাই পাশ কাটাবার মত করে বললাম, ভাই আমার সে রকম কোন সময় এসেছিল বলে মনে নেই।

ও তার মানে আপনি জীবন উপভোগে খুব বেশি উৎসাহী নন?

কি বলছেন এসব? একমাত্র যারা পাগল কিংবা সাধু তাদের এমন হয় আপনি আমায় তাই ভাবছেন? কিন্তু কেন? আমি প্রায় ক্ষেপেই গেলাম।

লোকটি প্রায় কেঁদে ফেলার মত করে বলল, আপনি কিছু মনে করবেন না, এই আমার এক বদ অভ্যাস। আমি আমার চারপাশের মানুষের সম্পর্কে জানতে চাই। এও অনুভূতি শেয়ার করার মতই , কি বলেন?

এই লোকটির নাম মমিন। তার চারপাশের মানুষজন তাকে এই নামেই ডাকে। আমি এসেছিলাম এর বাড়িতে বাড়ী ভাড়া চাইতে। তখন এই কথা সেই কথার মাঝে আমার ফ্যামিলি মেম্বার কত জিজ্ঞেস করায় আমি প্রায় ক্ষেপে গিয়ে বলেছিলাম, আপনার ফ্যামিলি মেম্বার কত? তারপরের কথাতো শুনলেন। আমি কিছুটা নিশ্চিন্ত যে এই লোকের বাড়িতে ভাড়া থাকব না। লোকটির সাথে কথা না বাড়িয়ে বের হবার চেষ্টা করতেই আবার ডাক এল- স্যার, খাড়ান খাড়ান।

পেছনে ফিরে দেখি, অন্য লোক। কেয়ারটেকার স্টাইল। আমাকে অনেক বিনয়ের সাথে ডাকছে সেটা বোঝার জন্য তার শরীরের ভাঁজটাই যথেষ্ট। যাব কি যাব না করে তবু গেলাম। বললাম- কি ব্যাপার?

স্যার, আপনে বাসা ভাড়া নিবেন না তাতে কি হইছে, এক কাপ চা খেয়ে যান। মমিন সাহেবের বাসায় কেউ এলে খালি মুখে যায় না, যাইতে পারে না।

কিন্তু মমিন সাহেব তো আমাকে বলেন নাই।

জি হ্যাঁ, তিনি ভেবেছেন, আপনাকে তিনি বেশি ডিষ্টাব দিছেন, তাই আমাকে দিয়ে রিকোয়েস্ট পাডাইছে। আসেন স্যার ভেতরে।

এই পর্যায় থেকে আর ফিরে আসা যায় না। আমি এতটা অভদ্র নই। চা এর দাওয়াত কবুল করে বাসা ভাড়া কনফার্ম করে ফেললাম। এই শুরু হল নতুন বাসায় থাকা। কিন্তু মমিন সাহেরবের সাথে আমার এই দিনটি খুব স্মরণীয় হয়ে গেল। একটা লোক যাকে সামনে থেকে দেখে বোঝার উপায় নেই তার ভেতরে কি আছে, কতটা সে মানুষ। তারপর যত দিন গেছে আমি শুধু মুগ্ধ হয়ে গেছি তার কাজ কারবার দেখে।

এই জীবনে আমি ডায়েরি লিখি নাই, আজ প্রথম লিখতে বসেছি। তাও আবার মমিন সাহেবের বাসায় পনের দিন পার করার পর। ভেবেছি , আমি যদি ডায়েরি বন্দি না করি তবে এই সব স্মৃতি ভুলেই যাব। জীবনে কত দিন গেল হিসেব নেই, কত ঘটনা গেল তাও মনে নেই বেশির ভাগ। এটা মনে আছে, মমিন সাহেবের মত মানুষের সাথে এটাই প্রথম দেখা আমার। আমার জীবনের সবচে আনন্দময় মুহুর্তের কথা জানতে চেয়েছিলেন তিনি, এখন আমার মনে হচ্ছে সেই দিনটিই হবে আনন্দময় যেদিন তার মত লোককে একটু দেরিতে হলেও ঘটনাস্থলেই বুঝতে পেরেছিলাম। যদি না পারতাম তবে কি হত? এত ভাল মনের জ্ঞানী একজন মানুষের সাহচর্য থেকে বাদ পড়ে যেতাম।

সে যাই হোক, তার সাথে আমার ভাল ভাবে কথা বলা শুরু হয়ে গেল। দ্বিতীয় দিন তিনি আমাকে সামনে পেয়ে বললেন, হাই ম্যান!

আমি ঈষৎ হাসি ফুটিয়ে বললাম, হাই। কেমন আছেন?

ভাল না ভাই, বাসায় বাজার তেমন ছিলোনা তাই বাজারে নিজেই গেলাম। কিন্তু এটা যে বাজার তা মনেই হলোনা। বাজারে মানুষ এত সেবা পায়? কি আদর আর বীণয় আহারে!

আমি মনে মনে বললাম, মেগা মলে গিয়েচেন তো, দেশের অন্য বাজারের খবর জানার কথাতো নয় আপনার।

কি ব্যাপার ? আপনি কিছু বলছেন না যে, আমি কি কিছু বেঠিক বলে ফেললাম?

না, ঠিক আছে। বাজারে সেবা আগের চেয়ে ইম্প্রুভড হয়ে গেছে। মানুষের মাঝে বিনয়ের ব্যাপার চলে এসেছে। তবে সব কিছুই টাকার জন্য। ব্যাবসায়ীরা এখন কাষ্টোমারের চাহিদা বোঝে।

হ্যাঁ, ঠিকই ধরেছেন। আমি সেই ভাবে ভাবি নি, কিন্তু আপনি ভাবছেন। আপনি মশাই অনেক ভাল মানুষ।

আরে না না, কি যে বলেন! আমি সাধারণ মানুষ।

 

 

 

চলবে………