জঙ্গি এবং ধর্ম

জঙ্গি এবং ধর্ম

ধর্ম অনেক প্রাচীন আর জঙ্গি অনেক নতুন এমন মনে করার কোন কারন নেই। ধর্ম এসেছে মানুষের জীবনের শুরু থেকেই। এভাবে যখন মানুষ ভেবেছে মুক্তির উপায় খুঁজতে তখন দেখা পেয়ে যায় ধর্মের। যুগে যুগে যত ক্রাইসিস এসেছে তত ধর্মও এসেসে। তাই ধর্ম সংখ্যা শতাধিক। যুগে যুগে ক্রাইসিস এত কম এসেছিলো? না, যুগে যুগে কিংবা বহু হাজার বছর আগে মানুষের ভূ-খন্ড ছিলো অনেক কম, তখনো সব দিক জানা ছিলো না। ভৌগলিক লোকেশনের নীরিখে ধর্ম যখন যেখানে আবির্ভুত হয় সেখানকার সিচুয়েশন নিয়ন্ত্রনে নেয়। ধর্মীয় নীতি বেশিরভাগই মানবতার পথ প্রদর্শক ছিলো। একেক ধর্ম একেক রকম কেন তাহলে? ধর্মে শুরু হয় মানুষের পক্ষে কথা বলা। বিশ্বে সর্বোচ্ছ পরিচিত চার পাচ ধর্মের ইতিহাস দেখলে বোঝা যায় ধর্ম শুরুর আগে সে এক অনাচারী জীবন ছিলো। ধর্মই সেখান থেকে বের করে নিয়ে আসে মানুষকে। কিছু ধর্মের আগে সমকামীতার জোয়ার ছিলো, কিছু ধর্মের আগে বাচ্চা মেয়েকে জীবন্ত কবর দিতো, কিছু ধর্মের আগে মানুষ মানুষের মগজ খেত, আবার কিছু ধর্মের আগে মানুষ মানুষকে বিক্রি করে দিত। ধর্ম আসার আগে একেক লোকেশনে একেক ধরনের অপরাধ চালু ছিল। সেটা সামাজিক স্বীকৃত ছিল। ধর্মই সেসব করা থেকে মানুষকে সরিয়ে নিতে চেয়েছে। অনেক ক্ষেত্রে সফলও হয়েছে। এভাবেই ধর্মের সৃষ্টি। মহান স্রষ্টাই ধর্মের প্রেরক। আর মহামানবেরা তার বাহক। হয়ত এটাই সত্যি।এরকম করেই ধর্ম আসে খ্রিষ্ট ধর্ম, বুদ্ধ ধর্ম, হিন্দু ধর্ম, ইসলাম ধর্ম।

একেক ধর্ম চালু হয় একেক এলাকায়। মহাদেশে কিংবা দেশে। একেক এলাকার ভাষা সংস্কৃতি একেক রকম হওয়ায় ধর্মের ভাষা সংস্কৃতি একেক রকম। কেউ মন্দির বানায়, কেউ প্রাগোডা, কেউ মসজিদ আবার কেউ মানায় উপাসনালয়। এসব উপাসনালয়ে মানুষ যায় মহামান্য স্রষ্টাকে খুঁজে পেতে। স্রষ্টার আরো কাছে যেতে। এভাবেই এক সময় নিজেদের মধ্যে আসে প্রতিযোগীতা। কিছু কিছু মানুষের পরকালের এত লোভ লাগে যে যদি শুনে বড় অপরাধেও পরকাল পাওয়া যায় তখন সেই অপরাধ করতে পিছপা হয় না। এই ঘটনায় যারা ধর্মীয় প্রচার কার্য চালায় তারাই দায়ী। ধর্মকে নিয়ে অনেকেই মাথা ঘামায় না। এটা নিচক একটা ধর্ম। কিন্তু প্রত্যেক ধর্মে আছে কিছু নীয়ম। লিখিত নিখঁত বানী, নির্দেশিকা। এর বাইরে চলাফেরা করা যাবে না এরুপ। কে শোনে কার কথা। লিখিত বানী বা নির্দেশিকা পড়ে বুঝতে পারার প্রয়োজন নেই কারো। সবাই শুধু অন্যের উপর নির্ভর করে বসে থাকে। আলেম ওলামা, সন্যাসী সাধক, ফাদার কিংবা যাজক যা বলবেন আমরা তাই শুনবো এমন ভাব নিয়ে ধার্মিক হয় আজকালকার মানুষ। তারা সামান্য সময় নিয়ে পড়তে চায় না বিধানে কী বলা আছে। এভাবেই ছড়িয়ে পড়ে কিছু বিভ্রান্তি আর ধর্মে ধর্মে ক্ষোভ হিংসা। একেক ধর্মের মানুষ মনে করে তারাই সঠিক অন্যরা ভুল। কিছু মানুষ আবার ধর্মই মানতে নারাজ।

অনেকেই জানেন, ধর্ম একটি সমস্যার নাম। একে বাদ দিতে পারলে সারা পৃথিবীর মানুষের মধ্যে তেমন আর ভাগ থাকে না। থাকে শুধু দেশটাই একটা দেয়াল। কিন্তু এই ধর্মই এক সময় সমস্যার সমাধান ছিলো। যখন আরবের মানুষ মানুষ ছিলো না তখন মহানবী হযরত মুহাম্মদ (সঃ) মানুষকে এমন একটা দিক দেখাতে সক্ষম হন যা পুরো আরবকে নাড়িয়ে দিয়েছিলো। তিনি মানুষ ছিলেন এটা অনেকেই মানতে রাজি নন। অবশ্যই তিনি মহানবী ছিলেন, কিন্তু রক্তে মাংশে গড়া একজন স্বাভাবিক মানুষ অবশ্যই ছিলেন। তিনি বিয়ে করেছেন, বাচ্চা জন্ম দিয়েছেন। খেয়েছেন। মানুষের সব কাজ তিনিও করেছেন। অথচ অনেক ইসলামিক ওলামা তাঁকে মানুষ মনে করেন না। এবং তাঁকে মানুষ বললে না কি পাপ হবে এমন উক্তি দিয়ে থাকেন। এই ঘটনা অন্যান্য ধর্মেও আছে। অনেক ধর্মে বর্তমানে যারা ধর্মের সেবা করছেন তাদেরকেও মানুষ মনে করা হয় না। মনে করা হয় তারা স্রষ্ঠার দূত। এখান থেকে বুঝতে পারা যায় ধর্ম যখন ছিলো না তখন যেমন মানুষ বোকা আর পশু ছিলো তেমনি ধর্ম পেয়ে তার অধিক গুরুত্ব দিয়ে আরো বেশী মাত্রায় বোকা হয়েছে। সত্যি বলতে কি ধর্ম এসেছিল মানুষের কল্যানে, বোকা বানাতে নয়।

ধর্মের জন্য মানুষ নাকি মানুষের জন্য ধর্ম এটাই যখন মানুষ বুঝতে পারে না তখন তারা নিজেদের গুরুত্ব দিবে কিভাবে? ভুল তো মানুষের হবেই, সে ভুল ধরিয়ে দিতে হবে তো?

একেক ধর্মের মানুষ একেক ভাবে নিজেদের আধিপত্য বিস্তারে সজাগ। ধর্ম যেখানে মহান স্রষ্টাকে সন্তুষ্ট করার নাম সেখানে মানুষ নিয়েছে অন্য বলিদান। যেমন অনেক ধর্মেই আছে স্রষ্টার নামে পশু বলিদান, হিন্দুরা পাঠা বলি দেয়। মুসলিমরা পশু কোরবানী দেন, আর অন্যান্য ধর্মীয়রাও দেয়। এর মধ্যেই চলে এসেছে বিভ্রান্তির আরেক মাইল ফলক। বিধর্মীদের বলি দেয়া। প্রচারকারী ধর্মীয়রা দিয়েছে এই বুদ্ধি। এভাবেই শুরু হয় জঙ্গি উন্থান। এটা আগেও ছিলো। যখন কোন ধর্ম ছিলো না তখন নিজেদের জন্য করত। যখন ধর্ম এলো তখন ধর্মের জন্য করছে। আবার এই সুযোগ অনেকেই নিচ্ছে যারা সন্ত্রাসকেই ধর্ম মানে। তাহলে মানুষের পথ দেখানো ধর্ম কিভাবে মানুষকে বলি দিতে পারে? এভাবেই ধর্ম হয়ে যায় মানুষের শত্রু। জীবনের শত্রু। জঙ্গিরা ধর্ম প্র্যাকটিস করে বলে মনে হয় না। তারা শুধু ক্ষোভ আর নির্দেশ মেনে চলে। তাদের যে পথে ধাবিত করা হয়েছে যা বুঝানো হয়েছে তা ই বুঝতে চায়, এর বাইরে কোন কিছুই নয়। এক সময়ের সুন্দর ধর্ম হয়ে গেছে জঙ্গি।

এখানেও আছে বিতর্ক। জঙ্গি শুধু মুসলিম ধর্মে আছে অন্যান্য ধর্মে নেই। এটা ভুল। জঙ্গি সব ধর্মেই আছে। জঙ্গি থাকবেই। ধর্মের বাই প্রোডাক্ট হচ্ছে জঙ্গি। তাহলে মুসলিম ধর্মে এ নিয়ে এত প্রচার কেন? কিছু ধর্ম আছে যারা আসলেই বিপথগামী। তারা নিজেদের জন্যই সকল ধর্মের কবর দিতে প্রস্তুত। এরা উগ্র ধার্মীক। এদের লক্ষ্য হচ্ছে ইসলাম ধর্মকে কনফিউজড করে দেয়া। এরা হিন্দু ধর্মকেও কনফিউজড করেছে। খ্রীষ্টান কিংবা বুদ্ধদেরও এরা নজরে রাখছে। উগ্রপন্থী এই ধর্ম চায় একে একে সকল ধর্মের ধ্বংস। এক সময় এরা শুধু নিজেদের ধর্মকে নিয়েই স্বপন দেখে। এরা হয়ত অনেক চালাক। আপাত দৃষ্টিতে মনে হচ্ছে এরা এখন ইসলাম ধর্মকে ধরেছে। এদের মিশন হচ্ছে এই ধর্মকে বিশ্বের কাছে ক্রাইম সাইন হিসেবে তুলে ধরা। তখন বিশ্বায়নের এই যুগে মুসলিমেরা হয়ে যাবে কোনঠাসা। ধীরে ধীরে তারা অন্যান্য ধর্মের দিকে এগোবে। সব ধর্মই একদিন কোনঠাসা হয়ে পড়বে। এভাবেই একটি ধর্ম পৃথিবীর বুকে দাঁড়াবে। অনেকেই হয়ত এমন ধারনা আঁচ করতে পারছেন।

মানুষের বেঁচে থাকার জন্য আর এই আধুনীক যুগে মানুষকে নিয়ন্ত্রনের জন্য ধর্মও একটি অস্ত্র একটি দিক। একে রাষ্ট্রীয়ভাবে নিয়ন্ত্রন প্রায় অসম্ভব হয়ে গেছে। অথচ একে নিয়ন্ত্রন করা যায়। সব কিছুরই সমাধান থাকে। নির্ভুল সমাধান ই বুদ্ধিমত্তার দাবীদার। দেশের ভেতরের মানুষ কিভাবে জংগি গোষ্ঠীর সাথে হাত মিলায়, তা একমাত্র আমাদেরই ব্যর্থতা। এখান থেকেও যদি আমাদের ধর্মীয় ভিত কে সরকারীভাবে মনিটর না করা হয় তবে এর ফলাফল অনেক বেশী মধ্যযুগীয় হতে পারে।

তাহলে সরকার কি ধর্ম কর্ম বন্ধ করে দিবে? সেটা কখনোই ঠিক হবে না। ধর্ম কর্ম মানুষের নৈতিক সম্বল। এর দিকে আংগুল তোলা উচিৎ নয়। ধর্ম কর্মের মধ্যে সরকার নিজেকে আরো বেশি নিয়োজিত করেই এর সমাধান আনতে পারে। বাংলাদেশ ব্যাংক যদি সকল বেসরকারী ব্যাংকের ট্রাঞ্জাংকশন মনিটরিং করতে পারে তবে কেন ধর্ম মন্ত্রনালয় এদেশের ধর্মকে মনিটর করতে পারবে না? পারবে এবং সেটা অবশ্যই বড় মাপের চ্যালেঞ্জ।